
বিশেষ প্রতিনিধি :
দেশের আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এখন চরম অস্থিরতা, অনিয়ম এবং একটি বিশেষ সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে। গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের তড়িঘড়ি অব্যাহতি এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। বিশেষ করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী চক্রের কারণে হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন সংকটের মুখে পড়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রারকে চাপের মুখে সরিয়ে দেওয়ার পর থেকেই অস্থিরতা শুরু হয়। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞ চুক্তিভিত্তিক পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আখতারুজ্জামানকে মাত্র ৩০ মিনিটের নোটিশে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর রেজিস্ট্রার পদে লিয়েনে নিয়োগ পান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-রেজিস্ট্রার আইয়ুব হোসেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তার নিয়োগে কোনো বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৩ সালের আইন লঙ্ঘন করে নির্বাচনী বোর্ড বা সিন্ডিকেটের অনুমোদন ছাড়াই লিয়েনে দুইজন অধ্যাপক নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরে তাদের ডিন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) লিখিত আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কামিল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ডিন অধ্যাপক ড. ওয়ালীউল্লাহর বিরুদ্ধেও উপাচার্যের সরলতাকে পুঁজি করে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মাদ্রাসার গভর্নিং বডিতে অধ্যক্ষের প্রস্তাবের বাইরে আর্থিক বিনিময়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সভাপতি ও বিদ্যোৎসাহী সদস্য করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, ফলে বহু মাদ্রাসায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীরা মাসের পর মাস বেতন পাচ্ছেন না।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর অব্যাহতির আবেদনের প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়।
এদিকে, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পদে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয় মোহাম্মদ আলীকে, যার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞতা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ভিসির পিএস আরিফুল ইসলাম ও সাবেক ছাত্রনেতা সাব্বীরসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর, সনদ শাখা ও ক্রয় কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করেন।
আরও অভিযোগ উঠেছে, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ফাজিল, কামিল ও অনার্সের শত শত শিক্ষার্থীর ফলাফল অকারণে ‘উইথহেল্ড’ বা স্থগিত রাখা হচ্ছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে কৃত্রিম জট তৈরি করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোহাম্মদ আলী নিজেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে পদ টিকিয়ে রাখতে লবিং করছেন। তার এই তৎপরতার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কিত নিয়োগপ্রাপ্তদের টিকিয়ে রাখার চেষ্টা রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বলেন, একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। দ্রুত ফল প্রকাশ করা হলেও হাজারো শিক্ষার্থীর ফল এখনো স্থগিত রয়েছে, যা তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এদিকে ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগসহ সামগ্রিক অনিয়ম ও লিয়েন কর্মকর্তাদের বিষয়ে তদন্ত চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ ধারায় ফিরিয়ে আনা হোক।
Subscribe to get the latest posts sent to your email.