
মোঃ বাদশা প্রামানিক, নীলফামারী প্রতিনিধিঃ
নীলফামারীর ডিমলায় তিস্তা নদীকে ঘিরে সক্রিয় থাকা অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনকারী সিন্ডিকেটের এক ন্যাক্কারজনক তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করলো এলাকাবাসী। সিন্ডিকেটের অবৈধ আস্তানায় বাধার সৃষ্টি করায়, চক্রটি প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। এই ভয়াবহ হামলায় ৯নং টেপাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন, পুলিশ সদস্য, বিজিবি, আনসার, সংবাদকর্মী এবং স্থানীয় বাসিন্দা সহ প্রায় অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন। এদের মধ্য ১০ জন গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, যাদের মধ্যে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহীনসহ ৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর সরকারি কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) সকাল ১১টার দিকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার টেপা খড়িবাড়ি ইউনিয়নের চর খড়িবাড়ি এলাকায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। জানা গেছে, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধভাবে ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে তিস্তা নদীর বুক চিরে বালু ও পাথর উত্তোলন করে আসছিল। এতে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাঁধ ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। এই অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিন প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় অভিযানে নামলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে ওই অবৈধ সিন্ডিকেট।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অভিযানের খবর পেয়ে পূর্ব পরিকল্পিতভাবে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দুর্বৃত্তরা চেয়ারম্যান এবং তার সাথে থাকা দলটির ওপর অতর্কিত ঝাঁপিয়ে পড়ে। তারা লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র এবং ইট-পাটকেল ব্যবহার করে নির্বিচারে হামলা চালায়। বাধা দিতে গেলে উপস্থিত পুলিশ সদস্য, আনসার, বিজিবি এবং সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকরাও রেহাই পাননি। হামলাকারীরা শুধু মারধর করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা সাংবাদিক, পুলিশ এবং চেয়ারম্যানের গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ন্যাক্কারজনক তাণ্ডব চালানো হয়, যা পুরো এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
হামলায় আহতদের চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম শাহিনসহ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দায়িত্বরত চিকিৎসক তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। বর্তমানে ১০ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের মধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানসহ মোট ৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
এই বর্বরোচিত হামলার খবর মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নিন্দার ঝড় ওঠে। নেটিজেনরা এই দুঃসাহসিক হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর মতে, এই হামলা শুধু একজন ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির ওপর নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর একটি বড় চপেটাঘাত।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরানুজ্জামান কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। আমরা ইতিমধ্যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। নদীর প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি বজায় থাকবে এবং এই হামলার সাথে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
ঘটনার পর থেকে এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং নতুন করে কোনো সহিংসতা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। এলাকাবাসী এই অবৈধ সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন এবং দ্রুত ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।
Subscribe to get the latest posts sent to your email.