
অনলাইন ডেস্ক:
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ভারতজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রদেশের সেহোর জেলায় নর্মদা নদীতে হাজার হাজার লিটার দুধ ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। রাজ্যে শিশুদের পুষ্টিহীনতার মধ্যে ধর্মীয় আচারের নামে এই বিপুল পরিমাণ অপচয় একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে পরিবেশবিদরা নদীর বাস্তুসংস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনায় তোলপাড় চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের মতো দেশে যেখানে অসংখ্য শিশু পুষ্টিহীনতায় ভুগছে এবং স্কুলের ‘মিড-ডে মিলে’ পর্যাপ্ত দুধের অভাবে পানিতে দুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়, সেখানে হাজার হাজার লিটার দুধ নদীতে ঢেলে নষ্ট করাকে চরম পর্যায়ের অন্ধবিশ্বাস ও বিবেকহীনতা ছাড়া কিছুই নয়।
জানা গেছে, হিন্দুদের চৈত্র নবরাত্রি উপলক্ষে সেহোর জেলার সতদেব গ্রামে অবস্থিত ‘শ্রী দাদাজি দরবার পাতালেশ্বর মহাদেব মন্দির’-এ ২১ দিনব্যাপী একটি বিশাল ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। ১৮ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই অনুষ্ঠানে ৪১ টন ঘি ব্যবহার করে ‘মহাযজ্ঞ, শিব মহাপুরাণ পাঠ এবং ১৫১ জন ভক্তের দ্বারা দুর্গাপাঠ’ করা হয়। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি লগ্নে নর্মদা নদীকে ‘মা’ সম্বোধন করে প্রায় ১১,০০০ লিটার দুধ দিয়ে নদীর ‘অভিষেক’ করা হয়।
আয়োজক ও ভক্তদের দাবি, এটি তাদের গভীর বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। শ্রী শিবানন্দ মহারাজের অনুসারী পবন পাওয়ার জানান, নর্মদা নদী তাদের কাছে মায়ের মতো। তাই ভক্তিভরে এই অভিষেক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই অনুষ্ঠানটি ব্যক্তিগত অর্থায়নে করা হয়েছে এবং ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত নয়।
ভাইরাল ভিডিওটি প্রকাশের পর পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন যে, নদীতে দুধ ঢালা কোনো পুণ্য নয় বরং এটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দুধের বায়োলজিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ড (বিওডি) অপরিশোধিত পয়ঃ নিষ্কাশনের চেয়ে প্রায় ৩০০ গুণ বেশি। অর্থাৎ, ১১ হাজার লিটার দুধ নদীতে ফেলার অর্থ হলো প্রায় ৩৩ লক্ষ লিটার নর্দমার বর্জ্য নদীতে ফেলার সমান দূষণ। এর ফলে নদীর পানির অক্সিজেন দ্রুত ফুরিয়ে যায়, যা মাছসহ অন্যান্য জলজ প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, বিপুল পরিমাণ দুধ যখন পানিতে মিশে পচতে শুরু করে, তখন তা পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন শুষে নেয়। ফলে মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর দম বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে। নর্মদা নদী ইতিমধ্যেই মাহসির মাছসহ প্রায় ৮০টি প্রজাতির মাছ হারানোর সংকটে রয়েছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করবে বলে মনে করেন তারা।
সমালোচকরা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে দুর্ঘটনাবশত দুধ নদীতে পড়লে প্রশাসন কত দ্রুত ব্যবস্থা নেয় তার উদাহরণ টেনে কড়া সমালোচনা করেছেন। তারা জানান, ব্রিটেনের ডেভন খামারে ৮০০০ লিটার দুধ দুর্ঘটনাবশত নদীতে মিশে গেলে পরিবেশ সংস্থা অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করে এবং পাম্পের সাহায্যে সেই দূষিত পানি সরিয়ে নেয়। দেশটিতে ২০১৭ সালে সমারসেটের এক খামারিকে ১৭০০ মাছ মারার অপরাধে ২২ হাজার পাউন্ড জরিমানা করা হয়েছিল।
ভারতের মধ্যপ্রদেশের মতো একটি রাজ্যে যেখানে অপুষ্টির হার অত্যন্ত বেশি, সেখানে এই অপচয় নিয়ে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা সচেতনতা তৈরির অভাবও স্পষ্ট। সরকারি তথ্যানুযায়ী, রাজ্যে বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং ১.৩৬ লাখ শিশু মারাত্মকভাবে অপুষ্টির শিকার। এছাড়া, ৫৭ শতাংশ নারী অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতায় ভুগছেন।
নেটিজেনদের প্রশ্ন, এই ১১,০০০ লিটার দুধ যদি অভুক্ত শিশুদের খাওয়ানো হতো, তবে কি তা আসল ‘ধর্ম’ পালন হতো না?
ভারতীয় সমাজে ধর্ম এবং বিজ্ঞানের এই চিরাচরিত লড়াইয়ে নর্মদা নদীর এই ঘটনা নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। বিশ্বাসের নামে পরিবেশ ধ্বংস এবং মানবিক প্রয়োজনকে উপেক্ষা করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বা সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার খবর পাওয়া যায়নি।পরিবেশবিদদের মতে, এই ধরণের অন্ধবিশ্বাস বন্ধ না হলে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা না শিখলে দেশের পরিবেশগত সংকট আরও ঘনীভূত হবে।
Subscribe to get the latest posts sent to your email.