
আলাখাই প্রতিনিধি:
হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলায় রোপা আমন মৌসুম ঘিরে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে পুরোনো সারের ডিলারদের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত একাধিক ডিলার ও রাজনৈতিক নেতারা। ফলে সরকারি নির্ধারিত দামে সার না পেয়ে অতিরিক্ত দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা।
সরেজমিনে জানা গেছে, সরকারি অনুমোদিত ডিলারদের দোকানে সারের সঠিক সরবরাহ নেই। অথচ বাজারে খুচরা পর্যায়ে বিভিন্ন দোকানে উচ্চ দামে সার পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি ডিলারদের গুদামে সার না থাকলেও তারা অন্য মাধ্যমে চড়া দামে সার বিক্রি করছেন।
লাখাই বাজারে বিসিআইসির ডিলার সুনীল দেবনাথ ও প্রদীপ কুমার রায়ের নাম থাকলেও বাস্তবে তাদের সার ব্যবসা পরিচালনা করছেন আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতা। স্থানীয় সূত্র জানায়, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবু জাহির, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মুশফিউল আলম আজাদ, সহ-সভাপতি যতীশ পাল ও কোষাধ্যক্ষ প্রিয়তোষ দাস তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িকভাবে জড়িত।
কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা এই সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। সরকারি দামে সার না পেয়ে খুচরা দোকান থেকে অতিরিক্ত দামে কিনতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
বিএডিসি ও বিসিআইসি দুই সংস্থাই আলাদাভাবে ইউরিয়া ও নন-ইউরিয়া সার সরবরাহ করে। ফলে কৃষকদের দুই জায়গায় ঘুরতে হচ্ছে। আবার ডিলাররা অনেক সময় স্থানীয়ভাবে সার সংরক্ষণ না করে সরাসরি কারখানা থেকে সার তুলে অন্য জেলায় বিক্রি করে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লাখাইয়ে বিসিআইসি অনুমোদিত ২০ জন ডিলার থাকলেও অধিকাংশই রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত বলে জানা গেছে।
এ প্রসঙ্গে লাখাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহাদুর ইসলাম বলেন, “সুনীল দেবনাথের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তারা এখনও সার উত্তোলন করেনি। তবে জানিয়েছে, বামৈ ইউনিয়নে একটি গুদামে সার তুলবে। বিষয়টি দেখে তারপরই সার বিতরণের অনুমতি দেওয়া হবে।”
আরওপড়ুন…জিয়াউর রহমানের আদি বাড়িতে কী আছে
সরকার সার বাজারে স্বচ্ছতা আনতে নতুন নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “আগে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাদের বাদ দিয়ে নতুনভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার অনুমোদন বন্ধ হচ্ছে। শিগগিরই নতুন নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্যদের ডিলারশিপ দেওয়া হবে।”
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, “সার ব্যবস্থাপনায় দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ থাকায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন করে প্রতিটি লেনদেনে ভাউচার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং চালু করতে হবে।”
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, আগামী নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সার সংকট হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সিন্ডিকেট ভাঙতে প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রান্তিক কৃষকদের প্রত্যাশা, সরকারের সদিচ্ছার বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সারের বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে এবং চাষাবাদে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।
Subscribe to get the latest posts sent to your email.