
ক্রাইমসিন সংবাদ:
শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জ, রাস্তাÑঘাটসহ দেশের সর্বত্র নীরব চাঁদাবাজি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি এমনকি সাধারণ মানুষকেও এই চাঁদাবাজির শিকার হতে হচ্ছে। চাঁদাবাজদের নীরব চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকিতে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে। এই দুর্বৃত্তদের ভয়ে তারা না পারছে আইনের আশ্রয় নিতে, না পারছে কিছু বলতে। চাঁদা না দিলে তাদেরকে হত্যার হুমকিও দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা নীরবে সয়ে যাচ্ছে, ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ হচ্ছে। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এর কিছুটা চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ৪ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশে ডিএমপি রাজধানীতে চাঁদাবাজির ¯পট ও চাঁদাবাজদের একটি তালিকা তৈরি করে। ডিবি, এসবি ও ডিএমপি কমিশনারের গোয়েন্দা ইউনিটের সমন্বয়ে তৈরি করা এ তালিকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে সরাসরি জড়িত ১ হাজার ২৮০ জনের নাম উঠে এসেছে। এদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়দাতা হিসেবে রয়েছে ৩১৪ জনের নাম। পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, তালিকায় নতুন নাম নিয়মিত যুক্ত হচ্ছে। ঢাকায় চাঁদাবাজিতে রাজনৈতিক নেতা ও ক্যাডারদের বাইরে সক্রিয় প্রায় ১৪৮ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। ডিএমপির তালিকা অনুযায়ী, এসব অস্ত্রধারীরা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় গুলশান, বাড্ডা ও রামপুরা এলাকায়। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশে চাঁদাবাজদের তালিকা ও বিশেষ অভিযান শুরু হয় চলতি মাসের ১ তারিখ থেকে। অভিযানে তালিকাভুক্ত চাঁদাবাজ হিসেবে এ পর্যন্ত তিনশর বেশি গ্রেফতার করা হয়েছে। বিশেষ অভিযানে সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। তালিকায় থাকা চাঁদাবাজদের বেশিরভাগই নিজেদের সরকারদলীয় নেতাকর্মী পরিচয়ে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে। চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ইতিমধ্যে বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠন থেকে অনেককেই বহিষ্কার করছে দলটি। চাঁদাবাজির তালিকায় রয়েছে পেশাদার সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ। অন্যান্য দলেরও কিছু নেতাকর্মীর নাম তালিকায় রয়েছে। কোথাও কোথাও চাঁদাবাজি চলছে মিলেমিশে।
চাঁদাবাজির অপসংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। বছরের পর বছর ধরেই তা চলে আসছে। চাঁদাবাজদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিংবা রাজনৈতিক দলের বিশেষ করে যে দল ক্ষমতায় থাকে, তার নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি করে। তাদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় ক্ষমতাসীনদলের একশ্রেণীর প্রভাবশালী নেতা। রাজনৈতিক যে অপসংস্কৃতি, তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে এই চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজরা মনে করে, ক্ষমতাসীনদলের নাম ও পরিচয় ব্যবহার করলে, তারা আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবে। অনেক ক্ষেত্রে থাকেও। তাদের রাজনৈতিক গডফাদারদের সমর্থনের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে কুণ্ঠিত হয়। ফলে দেশে চাঁদাবাজি একটি অলিখিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যখন যে দল ক্ষমতায় আসে, চাঁদাবাজির কাঠামো ঠিক রেখে সেই দলের চাঁদাবাজরা ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়া দলের চাঁদাবাজদের স্থলাভিষিক্ত হয়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার প্রায় দেড় দশকের শাসনামলে দেশে নীরব নয়, সরব চাঁদাবাজির নজির স্থাপিত হয়। চাঁদা না দেয়ায় অনেকে খুন-জখমের শিকার হয়। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার পতনের পর ধারণা করা হয়েছিল, মানুষ হয়ত চাঁদাবাজদের কবল থেকে মুক্তি পাবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, তাদের সেই মুক্তি মেলেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই নীরব চাঁদাবাজি শুরু হয়। এমনকি, চাঁদাবাজির অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার করলেও ধানমন্ডি থানা থেকে চাঁদাবাজদের ছাড়িয়ে আনতে দেখা গেছে। সে সময় ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি ব্যাপকভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলে। বিএনপিকে চাঁদাবাজের দল হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারা বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণায় চাঁদাবাজিকে মূল ইস্যু করে তাকে ভোট না দেয়ার আহ্বান জানায়। অস্বীকার করার উপায় নেই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিএনপির একশ্রেণীর নেতাকর্মী নীরব চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়ে। পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, যারা বছরের পর বছর ধরে চাঁদাবাজি করত, তারা পালিয়ে যাওয়ায় যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, সেখানে বিএনপির একশ্রেণীর নেতাকর্মী সেই শূন্যস্থান পূরণ করে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে বিএনপির হাইকমান্ড চাঁদাবাজির সাথে জড়িত প্রায় সাত হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করে। চাঁদাবাজির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে দল থেকে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিরুদ্ধেও বিভিন্ন পন্থায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠে। বলা বাহুল্য, চাঁদাবাজির এই অপসংস্কৃতি বিভিন্ন ফরমেটে হয়ে থাকে। কেউ সরবে, কেউ নীরবে, কেউ দলীয় স্লিপ দিয়ে এই অপকর্ম করে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসার পর চাঁদাবাজির সাথে জড়িত দলটির একশ্রেণীর নেতাকর্মী এবং পেশাদার চাঁদাবাজÑ যাদের কোনো দল নেই, যখন যে সরকার, সে সরকারের হয়ে যায়, তারাও বিএনপি পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজি শুরু করে। অনেকে অন্যের জায়গা-জমি অবৈধ দখলে মেতে উঠেছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া এবং অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিলেও তা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। গতকাল দৈনিক ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে তাই জানা যায়। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শিল্পপতি, কেউই চাঁদাবাজদের কাছ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। ফুটপাত থেকে আবাসন খাত কোনোটিই বাদ যাচ্ছে না। আবাসন খাতে বাড়ি তুলতে গেলে, জমি কেনাবেচা করতে গেলে, ফ্ল্যাট কিনতে গেলে চাঁদাবাজদের চাঁদা না দিয়ে উপায় থাকে না। আর কয়েকদিন পর ঈদুল আযহা। মানুষ কুরবানি দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। পশু কেনাবেচা ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মানুষ টাকা নিয়ে হাটে যাচ্ছে। শত শত কোটি টাকার লেনদেন হবে। এ সময়ে চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারিরা পথে পথে ওঁত পেতে থাকে। ক্রেতা-বিক্রেতারা যদি এই দুর্বৃত্তদের শিকারে পরিণত হয়, তাহলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এদের নিরাপত্তা, নিশ্চিন্তে চলাচল এবং সচেতন করার ক্ষেত্রে সরকার কি কি ব্যবস্থা নিয়েছে, তা এখন পর্যন্ত জানা যায়নি।
বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে বিএনপিকে দেশের মানুষ ক্ষমতায় বসিয়েছে। সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন দিয়ে তারা আর কোনো সরকারকে বসায়নি। সঙ্গতকারণেই বিএনপি সরকারের প্রতি তাদের আশা-আকাক্সক্ষা আকাশছোঁয়া হবে। তাদের জীবনযাপনের উন্নতি, নিরাপত্তা, সুখ-শান্তি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নতি হবে, বিএনপি সরকারের কাছ থেকে তারা চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। সে জায়গায় যদি, তাদেরকে চাঁদাবাজিসহ ভয়ভীতির মধ্যে থাকতে হয়, তাহলে বিএনপির প্রতি কি তাদের সেই আস্থা থাকবে? শুধুমাত্র অল্পসংখ্যক দলীয় পরিচয়ধারী দুর্বৃত্ত ও চাঁদাবাজদের জন্য সরকারিদল হিসেবে বিএনপির ব্যাপক বদনাম হচ্ছে। বিএনপির প্রতি মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই কিছু সংখ্যক চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের জন্য সরকার ও দলের বিশাল ক্ষতি হওয়া কি গ্রহণযোগ্য হতে পারে? পাশাপাশি বিরোধীদল বিএনপি ‘চাঁদাবাজের দল’ বলে যে ন্যারেটিভ চালিয়ে আসছে, তা সত্যে পরিণত করার সুযোগ দেয়া কি সমীচীন হচ্ছে? বলা বাহুল্য, নীরব চাঁদাবাজির কারণে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সামনে স্থানীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। দেখা যাবে, নীরব চাঁদাবাজির কারণে ক্ষুব্ধ-বিক্ষুব্ধ মানুষ বিএনপির সমর্থিত প্রার্থীদের নীরবে প্রত্যাখ্যান করবে। বিরোধীদল সমর্থিত প্রার্থীরা নিশ্চিতভাবেই বিএনপিকে চাঁদাবাজের দল হিসেবে ভোটারদের সামনে তুলে ধরবে। এতে দল হিসেবে বিএনপির ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা আশংকা করছেন। চাঁদাবাজদের কারণে সরকার ও দলের এই ক্ষতি বিএনপি মেনে নেবে কিনা, তা এখনই ভাবতে হবে। চাঁদাবাজ কখনোই দলের হতে পারে না। তারপরও দলের দুর্বৃত্ত শ্রেণীর আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যারা চাঁদাবাজি করছে, তাদের চিহ্নিত করে বিএনপিকে তাদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। দল থেকে বহিষ্কার তো বটেই, আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের যথাযথ সাজা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কেউ চাঁদাবাজি করতে সাহস না পায়।
আরওপড়ুন…… ঐতিহ্যবাহী কাজীপুর সোনামুখী পশুর হাটে উপচে পড়া ভিড়, জমজমাট বেচাকেনা
Subscribe to get the latest posts sent to your email.